পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগে বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জ ও নতুন দিগন্তের হাতছানি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পরমাণু শক্তির অভিজাত ক্লাবে (Nuclear Club) নিজের নাম লিখিয়েছে। দেশ যখন তীব্র জীবাশ্ম জ্বালানি সংকট, ডলার সাশ্রয়ের চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, তখন পারমাণবিক যুগে প্রবেশ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার এক বড় চালিকাশক্তি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কেবল বিদ্যুতের ঘাটতিই মেটাবে না, এটি দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে। এক বিশাল লাফ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা পরমাণু প্রযুক্তির জটিল বিষয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা লাভ করছেন, যা ভবিষ্যতে দেশের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (যা দক্ষিণাঞ্চলে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে) নির্মাণে পথ দেখাবে। রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। যার প্রথম ইউনিটে জ্বালানি-লোডিং সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও চলছে পুরোদমে। আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে; কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাঠামোগত প্রয়োজনে ব্যয়িত হবে। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানিভরনের কাজ শুরু হবে। অনুরূপ হিসাবেই ওই বছরের সেপ্টেম্বরে রূপপুরের দুটি ইউনিট থেকে মোট ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার ঝক্কি এখানে নেই। দেড় বছর পর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ তিন বছর জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এ সময়ে এখান থেকে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। পারমাণবিক যুগে প্রবেশ যেমন সম্ভাবনার, তেমনি এর সুষ্ঠু পরিচালনা ও নিরাপত্তার পেছনে রয়েছে বিশাল চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক পরমানু শক্তি সংস্থা (IAEA) আপাতত সন্তোষ জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎউৎপাদন সক্ষমতায় বাংলাদেশকে কারিগরি দক্ষতা অর্জন করার পাশাপাশি গ্রিড আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) গাইডলাইন কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। পারমানবিক বিদ্যুৎ একন্দ্র পরিচালনার ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশের দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য পদ্মা ও যমুনা নদীর ওপর দিয়ে নদী পারাপার (River Crossing) সঞ্চালন লাইনসহ উচ্চক্ষমতার গ্রিড লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে গ্রিডের স্থিতিশীলতা (Stability) রক্ষা করা এখন প্রধান কারিগরি চ্যালেঞ্জ। গ্রিড ট্রিপ করলে বা কোনো ত্রুটি দেখা দিলে পারমাণবিক কেন্দ্র সচল রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। রূপপুর কেন্দ্রের ব্যবহৃত পারমাণবিক বর্জ্য (Spent Fuel) রাশিয়া নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যাওয়ার চুক্তি করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় স্বস্তি। তবে প্ল্যান্টের সার্বিক সাইবার নিরাপত্তা এবং ফুকুশিমা বা চেরনোবিলের মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশের নিজস্ব 'নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি অথরিটি' (BAERA) এবং জনবলকে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ করে তোলা জরুরি। পাশাপাশি রূপপুর সংশ্লিষ্ট সব নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ে জাতীয় সমন্বয় কমিটি আ ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেশন অথরিটি থাকা দরকার। সেটি গঠন নিয়েও সঙ্কট চলমান রয়েছে। পারমানবিক শক্তির দেশ হলে আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনীতিতে নানা ধরণের চাপ তৈরি হয়। এছাড়া রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে রূপপুর প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধে অতীতে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। বর্তমান সরকারকে রাশিয়ার ১২ বিলিয়ন ডলারের এই ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বিকল্প মুদ্রা বা পেমেন্ট মেকানিজমও সামাল দিতে হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায় অভ্যন্তরিণ অনেক ঝুঁকিও রয়েছে। কেন্দ্র সচল রাখতে এবং চুল্লি ঠান্ডা রাখতে প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়, যা পদ্মা নদী থেকে নেয়া হবে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এবং ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে (মার্চ-মে) পদ্মা নদীর পানির স্তর মারাত্মকভাবে নিচে নেমে যায়। নদীর নাব্যতার সংকট দেখা দিলে চুল্লি ঠান্ডা রাখার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। ভৌগলিক কারণে রূপপুর এলাকাটি ভূমিকম্প জোন থেকে তুলনামূলক নিরাপদ জোনে অবস্থিত। তবুও রিখটার স্কেলে উচ্চমাত্রার কোনো ভূমিকম্প হলে বা পার্শ্ববর্তী ফল্ট লাইনে বড় কোনো বিপর্যয় ঘটলে পারমাণবিক চুল্লির স্বয়ংক্রিয় কুলিং সিস্টেম (শীতলীকরণ প্রক্রিয়া) সচল রাখা নিয়ে বড় পরীক্ষা দেতে হবে ভিভিআর-১২০০ প্রযুক্তিকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো সাধারণত জনমানবহীন বা কম জনঘনত্বপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। রূপপুর কেন্দ্রের তিন থেকে পনের কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ বসবাস করেন। কোনো কারণে যদি অত্যন্ত ক্ষুদ্র মাত্রারও তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে (Nuclear Leakage), তবে এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যাকে দ্রুত এবং নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া (Evacuation) প্রায় অসম্ভব। পারমাণবিক শক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের মিথ ও আতঙ্ক থাকে। যেকোনো ছোটখাটো কারিগরি ত্রুটিকে কেন্দ্র করে যেন জনমনে বড় ধরনের আতঙ্ক বা গুজব না ছড়ায়, সেজন্য স্বচ্ছ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ । সেটির জন্য সরকারকে সবসময় জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগে বাংলাদেশের পদার্পণ দেশীয় অর্থনীতির জন্য এক নতুন ভোরের সূচনা। কারণ এর সফল বাস্তবায়ন দেশের জ্বালানি খাতের চেহারা চিরতরে বদলে দিতে পারে। পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায় চ্যালেঞ্জগুলো জটিল হলেও মোকাবেলা অসম্ভব নয়। বাংলাদেশকে পারমাণবিক যুগকে টেকসই করতে দেশীয় জনবলকে বৈশ্বিক মানের দক্ষ করে তুলতে হবে এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) গাইডলাইন পুরোপুরি মেনে চলার ব্যাপারে ছাড়া না দেয়ার ব্যাপারে দূঢ় থাকতে হবে।
রিশান নাসরুল্লাহ সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট , এটমিক রিপোর্টার্স বাংলাদেশ-এআরবি
