জ্বালানি সঙ্কটে অর্থনীতির রক্তক্ষরণ

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বহুমাত্রিক এবং রূপান্তরকালীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। চলতি মে ২০২৬-এর তীব্র গরমে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ১৭,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও লোডশেডিং এবং সরবরাহ সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি মিলছে না। তীব্র ডলার সংকট, আমদানি নির্ভর প্রাথমিক জ্বালানি এবং বিশাল ভর্তুকির বোঝা খাতটিকে বহুমুখী সঙ্কট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান সময়ে সবচে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ খাতে আর্থিক বোঝা ও বকেয়া ঋণ। বিদ্যুৎ খাতে এই মুহূর্তে বকেয়া পাওনা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। দেশীয় বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র (IPP) এবং ভারতীয় আদানি পাওয়ারের বকেয়া পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে, অর্থের অভাবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো আছে কয়লা সঙ্কটে। জ্বালানি আমদানিতে বিপুল ভর্তুকি দেয়ার চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এবং জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতি বছর সরকারকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গত ৫ বছরে এই ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৩৩,২৬৮ কোটি টাকা। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং ডলারের উচ্চ মূল্যের কারণে দেশীয় বাজারে ডিজেল (১১৫ টাকা/লিটার), পেট্রোল (১৩৫ টাকা/লিটার) এবং ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ১,৯৪০ টাকায় ঠেকেছে। সম্প্রতি বিপিডিবি পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭% থেকে ২১% বাড়ানোর প্রক্রিয়া জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। এছাড়া ভর্তুকী কমাতে চাপ রয়েছে আইএমএফেরও। নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান না করায় দেশীয় খনিগুলোর উৎপাদন কমছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে আমদানিকৃত এলএনজি ও কয়লার ওপর নির্ভরতা এখন প্রায় শতভাগ, যা ভূ-রাজনৈতিক কারণে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন কোয়ার্টারেই এলএনজি আমদানিতে সরকারকে আনুমানিক ১.০৭ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেশি হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে তার পূর্ণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বেসরকারি তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে চুক্তি অনুযায়ী বিপুল অঙ্কের 'ক্যাপাসিটি চার্জ' বা কেন্দ্র ভাড়া দিতে হচ্ছে। আইইইএফএ (IEEFA)-এর তথ্যমতে, গত অর্থবছরগুলোতে বেসরকারি তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় যথাক্রমে ৯.৫ টাকা এবং ৫.৯ টাকা পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে, যা সামগ্রিক উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী করেছে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা (ইরান-ইসরায়েল সংঘাত) এবং হরমুজ প্রণালি সংকটের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ চেইন চরম অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ৯০%-এর বেশি জ্বালানি আমদানির জন্য নির্ভরশীল হওয়ায় এই ধাক্কা সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে আঘাত করছে। জ্বালানি সংকটের কারণে দেশীয় উৎপাদন খাত বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে দেশের শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG), টেক্সটাইল, স্টিল, সিমেন্ট এবং সিরামিক শিল্প এক নজিরবিহীন ও করুণ দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কলকারখানার চাকা প্রায় স্থবির হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা সরাসরি দেশের রপ্তানি আয় এবং কর্মসংস্থানের ওপর আঘাত হানছে। শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ (BGMEA) এবং বিকেএমইএ (BKMEA)-এর মতে, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ালেও উদ্যোক্তারা তা মেনে নিতে রাজি, যদি নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু "উচ্চ মূল্য এবং শূন্য সরবরাহ"—এই দ্বিমুখী নীতি দেশের শিল্পখাতকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত জোরদার না করলে এই করুণ দশা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ) অংশ অত্যন্ত নগণ্য। নীতিগত জটিলতা এবং উচ্চ শুল্কহারের কারণে সৌরবিদ্যুৎ খাতের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ থমকে রয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতাদের 'সবুজ অর্থনীতি' বা গ্রিন ফ্যাক্টরির শর্ত পূরণে এই রূপান্তর দ্রুত করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএনপি সরকারকে এই সংকট থেকে বের হতে হলে "অ্যাড-হক" বা সাময়িক জোড়াতালির সিদ্ধান্ত থেকে বের হয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার করতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. তামিম ও অধ্যাপক ইজাজ হোসাইনের মতে, "নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশীয় জ্বালানি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং খাতটির অর্থনৈতিক বোঝা কমাতে দ্রুত নীতিগত সংস্কার। করদাতাদের টাকায় লোকসানি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ না করলে জাতীয় অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে রেকর্ড ভর্তুকি ও উচ্চ মূল্যের কয়লা-এলএনজি আমদানির চাপে বিশাল ঘাটতি তৈরি হবে। এর সাথে বৈশ্বিক সংকট ও বাড়তি ক্যাপাসিটি চার্জের চ্যালেঞ্জ তো থাকছেই। বিদ্যু ও জ্বালানি খাতের পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা (মোট এডিপির ১০.৯০%) বরাদ্দ দিয়েছে। তবে, এর সুফল কতটা পাওয়া যাবে, সেটা ভবিষ্যতই বলতে পারে।
রিশান নাসরুল্লাহ সাবেক নির্বাহী পরিচালক, ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ.
